Fan Zone

রিতা দাস

 

“কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া…” আমি যেদিন থেকে রবীন্দ্রনাথকে চিনেছি জেনেছি সেদিন থেকেই তাঁকে আমার হৃদয়মাঝারে আসন পেতে দিয়েছি, তিনি যে আমার সাধনার ধন, ধ্যানের ঈশ্বর, মনের মানুষ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের ভালোবাসার প্রাণপুরুষ। সুখে,দুঃখে বিরহে,শোকে-তাপে পূজার অর্ঘ্য নিবেদনে,প্রেম গানে তাঁর সংগীতের মহামন্ত্র আমাকে অফুরন্ত শক্তি যোগায়, ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে নবজীবনের আগুন জ্বালায়, জীবনের দুর্গমপথ পাড়ি দিতে কাউকে সঙ্গে না পেলেও অকুতোভয় হয়ে পথ চলতে মন্ত্রনা দেয়- “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে”। রবিঠাকুরের সংগীতের মধ্য দিয়ে আমি আমার ঈশ্বরকে দেখতে পাই,গভীরভাবে অনুভব করতে শিখি - “কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস” বা “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে” প্রভৃতি গানে। জড়া জীর্ন কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বুকে নবপ্রাণের প্রতিষ্ঠা দিতে- যৌবনপূজারী কবি যুবসমাজের কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে বিদ্রোহের মশাল জ্বালিয়েছেন- “আয় রে সবুজ আয় রে অবুঝ” বলে।স্বদেশ,স্বজাতি,মানুষ,প্রকৃতি ঈশ্বরকে গভীরভাবে ভালোবাসতে,অনুভব করতে এবং মা মাতৃভূমি, মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা,শ্রদ্ধা,কৃতজ্ঞতা, ও চিরঋণী থাকার মন্ত্র শেখায় রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সাহিত্য-সংগীত। মহাকালের স্রোতে একদিন সবাইকে ভেসে যেতে হবে- এই সত্য হৃদয়ে ধারণ করেও অমরত্বের বাসনায় মানুষ তাঁর সোনার ফসল দিয়ে পৃথিবীকে ঋদ্ধ করে যেতে চায়।তাই দৃঢ় কণ্ঠে কবির সুরে সুর মিলিয়ে উচ্চারণ করি - “ মরিতে চাহিনা আমি এই সুন্দর ভুবনে,মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই”।

    মিতা পাল

    কবিগুরু আমাদের জীবনে, মরনে, শয়নে, স্বপনে, বিপদে, দুঃখে, ভালবাসায় জড়িয়ে আছে। শিশুবেলায় প্রথম স্কুলে "আগুনের পরশমণি" দিয়ে শুরু দিন। বুঝতাম না কিন্তু সুরটা ভাল লাগত। একটু বড়ো হবার সাথে সাথে জীবনটা কবিময় হল, স্কুলে, পাড়ায় সবসময় বড়দের সাথে আমিও কবির গান, কবিতা, নাটক নিয়ে কম হলেও মজে আছি।

     

    কিন্তু জীবন তো একভাবে এগোয়না । হঠাৎ করে অন্ধকারময় হয়ে উঠল জীবন। আর্থিক সংকটের মধ্যে পরলাম। বাবা আসহায় এর মতো সত্যের পথ আগলে বসে থাকলেন। এত অপমানের মধ্যেও বাবা বলতেন "বিপদে মোরে রক্ষা কর, এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়।"

     

    এরপর কৈশোর কাটিয়ে ভরপুর যৌবন। রবীন্দ্রময় জীবন। অপমান, লজ্জা, ভয়, দুখঃ, ভালবাসা, জেদ সবার মাঝেই তিনি। শুরু হল খাদে পরে যাওয়া অন্ধকার, অবুঝের মত অফুরান ভালবাসা অস্বীকার করলাম। গেয়ে উঠলাম "প্রাণ চায় চক্ষু না চায়" কিন্তু পতনের শব্দ হলনা। চুরমার হওয়া মন নিয়ে বলে উঠলাম "তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম"। এরপর মাতৃত্বের স্বাদ, অন্য জীবন। মনে হল "আকাশ ভরা সূর্য, তারা, বিশ্ব ভরা প্রান"। অনেক ঘাত প্রতিঘাত কাটিয়ে জীবনের সায়াহ্নে বলি "বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি"। এই গান ভীষণভাবে প্রভাবিত করে আমাকে। সর্বোপরি বিদায়বেলায় কবির অমর সৃষ্টি সবার জীবনে "যখন পরবে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে"।

     

     

     

      কবিতা সাহা কর

      রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উনি বিশ্বের বিস্ময়। ভগবান দেখিনি ওনাকেও দেখিনি।কিন্তু যখন ওনার গান, কবিতা,নাটক আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনি। আমার ভালবাসাহীন জীবনের উওরণ ঘটায়। আমি বলি প্রানও ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরো আরো আরো দাও প্রান। ছোটো বেলায় মা শেখাতেন জনগন মন অধিনায়ক জয় হে। আমাদের জাতীয় সংগীত। কে লিখেছেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মা বেশ গর্ব করে বলতেন। কত কথা ওনারসম্পর্কে বলতেন। গান গাইতেন আলোকেরই ঝর্ণা ধারায় ধুইয়ে দাও। নিখিলের আনন্দ ধারায় ধুইয়ে দাও। আমি শুনতে শুনতে ঘুমাতাম।

       

      কিন্তু জীবনে নেমে এল অন্ধকার। পড়াশুনা মাঝপথে থেমে গেল।বাবা বিয়ে দিয়ে দিলেন। আমার কলেজ জীবনের শুরু সবে মনের প্রজাপতি উড়তে শুরু করেছে। প্রেমের জোয়ারে ভাসছি। গুনগুনিয়ে উঠছি ঘরেতে ভ্রমর এল গুনগুনিয়ে।বিয়ে সংসার স্বামী নতুন জগৎ কিন্তু আমার জন্য নয়। ভাবলাম যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝরে। মানুষিক, শারীরিক ভাবে বিপর্যস্ত। মনে মনে কবিকে স্মরণ করি। যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে।কিন্তু আমার জীননেও ভালবাসা আসে। আমি নতূন করে স্বপ্ন দেখি। বেঁচে উঠি। গেয়ে উঠি চরণ ধরিতে দিওগো আমারে নিওনা নিওনা সরায়ে। কিন্তু সেই ভালবাসা ছিল কি একতরফা।নাকি সবই মায়া।তবুও আশায় বুক বেধেঁ বলি।

       

      বহুদিন হল কোন ফালগুনে,

      ছিনুযবে তব ভরষায়,

      এলে তুমি ঘন বরষায়,

      আজি উত্তাল তুমুল ছন্দে,

      নবঘন বিপুল মন্দ্রে।

      আমার মন ও ধরণী শান্ত হোক। প্রনমী তোমারে নাথ।

      বরিষ ধরা মাঝে শান্তিরও বাণী।

        নিপন ভৌমিক

        কবি গুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর কে আমি মনে প্রানে খুব ভালবাসি, ওনার লেখা সাহিত্য গুলো ও খুব ভালো লাগে। তাই আমি এফ বি তে প্রতিদিন ওনার কিছু না কিছু সাহিত্য গ্রুপে পোস্ট করতাম, তাতে সবাই অনেক মুগ্ধ হতো। এর মধ্যে কিছু অপ্রিয় মানুষ ও ছিলো যা সমলোচনায় বিভ্রান্ত, এর জন্য আমাকে অনেক অপমান ও সইতে হলো। তবু আমি গ্রুপে সাহিত্য চর্চা করে গেছি। হঠাৎ কেউ একদিন আমার আই ডি টা লক করে দিয়ে আমাকে কবিগুরুর সকল গ্রুপে সাহিত্য চর্চা থেকে দূরে সরিয়ে রাখলো, থমকে গেলাম আমি কিছু দিনের জন্য, খুব কষ্ট পেলাম। তবে আজ আমি নতুন ভাবে আই ডি তৈরি করে, একটু একটু করে আমার সাহিত্য চর্চা অনুপেরনায় পথ চলতে সুরু করলাম। জানি তাতে অনেকের ভালো লাগবে, আবার অনেকের ভালো লাগবেনা। তবু বলতে চাই আমি আমার মতো,,, আমারো পরানো যাহা চায়, তুমি তাই তুমি তাই গো.....

        নিপন ভৌমিক, ফ্রম: বাংলাদেশ।

          শ্যামল চ্যাটার্জী

          রবীন্দ্রনাথ এবং ‘মহাজাতি’-র অন্বেষণ

          নিম্নে উদ্ধৃত অংশটি সুভাষচন্দ্র বসুকে ‘দেশনায়ক’ রূপে আখ্যায়নের প্রাককালে রবীন্দ্রনাথঠাকুরের অবিস্মরণীয় ভাষণের অংশবিশেষ যা প্রদত্ত হয়েছিল ১৯শে আগস্ট, ১৯৩৯ সালে মধ্য-কলকাতায় ঐতিহ্যশালী ‘মহাজাতি সদন’ (নামটি কবিরই দেওয়া)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে।

          ~উদ্ধৃতি~

          "সুভাষচন্দ্র,

          বাঙালি কবি আমি, বাংলাদেশের হয়ে তোমাকে দেশনায়কের পদে বরণ করি। গীতায় বলেন, সুকৃতের রক্ষা ও দুষ্কৃতের বিনাশের জন্য রক্ষাকর্তা বারংবার আবির্ভূত হন! দুর্গতির জালে রাষ্ট্র যখন জড়িত হয় তখনই পীড়িত দেশের অন্তর্বেদনার প্রেরণায় আবির্ভূত হয় দেশের অধিনায়ক। রাজশাসনের দ্বারা নিষ্পিষ্ট, আত্মবিরোধের দ্বারা বিক্ষিপ্তশক্তি বাংলাদেশের অদৃষ্টাকাশে দুর্যোগ আজ ঘনীভূত। নিজেদের মধ্যে দেখা দিয়েছে দুর্বলতা, বাইরে একত্র হয়েছে বিরুদ্ধশক্তি। আমাদের অর্থনীতিতে কর্মনীতিতে শ্রেয়োনীতিতে প্রকাশ পেয়েছে নানা ছিদ্র, আমাদের রাষ্ট্রনীতিতে হাল-দাঁড়ে তালের মিল নেই। দুর্ভাগ্য যাদের বুদ্ধিকে অধিকার করে, জীর্ণ দেহে রোগের মতো, তাদের পেয়ে বসে ভেদবুদ্ধি; কাছের লোককে তারা দূরে ফেলে, আপনকে করে পর, শ্রদ্ধেয়কে করে অসম্মান, স্বপক্ষকে পিছন থেকে করতে থাকে বলহীন; যোগ্যতার জন্য সম্মানের বেদী স্থাপন করে যখন স্বজাতিকে বিশ্বের দৃষ্টি-সম্মুখে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে মান বাঁচাতে হবে তখন সেই বেদীর ভিত্তিতে ঈর্ষান্বিতের আত্মঘাতক মূঢ়তা নিন্দার ছিদ্র খনন করতে থাকে, নিজের প্রতি বিদ্বেষ করে শত্রুপক্ষের স্পর্ধাকে প্রবল করে তোলে।’’

          ~অনুভূতি~

          ৭০ বছরের স্বাধীনতা আগত, অথচ এই ৭০ বছরের বৃদ্ধ মাতা (ভারত) আজও সেই ঈর্ষান্বিতের আত্মঘাতক মূঢ়তায় ছিদ্র হয়ে আছে।

          গুরুদেবের প্রবল দার্শনিক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এই উক্তি ভারতের এই জনসমুদ্রের প্রতি অঙ্গুলি নিদর্শন।

          নিবেদক
          শ্যামল চ্যাটার্জী
          মুম্বাই
          ২৩.০৭.২০১৭

            শ্যামল চ্যাটার্জী

            ~~~ ~~~ হে ২২শে শ্রাবণ তোমারে প্রনাম ~~~~~~~
            বেলা ১২টা বেজে ১৩মিনিট, আকাশ শ্রাবণাচ্ছন্ন, রবি  তখন মধ্যগগনে দিকভ্রান্ত হয়ে অস্তাচলে পদচিহ্ন রেখে "বিশ্ববাসীর কান্নার সমুদ্রে হারিয়ে গেলেন"।
            কবি নজরুল ইসলাম, কম্পিত শব্দে বিশ্ববাসীকে দিয়েছিলেন শান্তনার বাণী....
            "ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে,জাগায়ো না জাগায়োনা,
            সারা জীবন যে আলো দিল ডেকে তার ঘুম ভাঙায়ো না॥
            যে সহস্র করে রূপরস দিয়া
            জননীর কোলে পড়িল ঢলিয়া,
            তাহারে শান্তি চন্দন দাও, ক্রন্দনে রাঙায়ো না॥
            যে তেজ শৌর্য্য শক্তি দিলে আপনারে করি' ক্ষয়
            তাই হাত পেতে নাও।
            বিদেহ রবি ও ইন্দ্র মোদের নিত্য দেবেন জয়
            কবিরে ঘুমাতে দাও॥
            অন্তরে হের হারানো রবির জ্যোতি,
            সেইখানে তাঁর নিত্য কর প্রণতি।
            আর কেঁদে তারে কাঁদায়োনা॥

              শ্যামল চ্যাটার্জী

              কবিগুরুর প্রিয় ঋতু বর্ষা ঋতু, আর এই গান টি তিনি তাঁহার গীতবিতান এর প্রকৃতি পর্যায়ে শ্রেনীবদ্ধ করেছিলেন বর্ষা ঋতুকে হৃদয়ে আলিঙ্গন করে।


              উনি বিভিন্ন রাগঅঙ্গে গান নিবদ্ধ করেছিলেন ও এই গান বর্ষা ঋতুর প্রিয় রাগ মল্হারে বেধেছিলেন। গানটির ছন্দ ও তাল কাহারবা।
              নতুন প্রজন্মের শিল্পী গাগরী 'র কণ্ঠে গানটি শুনুন, খুবই শ্রুতিমধুর (Link to YouTube)।


              মন মোর মেঘের সঙ্গী,
              উড়ে চলে দিগ্‌দিগন্তের পানে
              নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণসঙ্গীতে
              রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম॥

              মন মোর হংসবলাকার পাখায় যায় উড়ে
              ক্বচিৎ ক্বচিৎ চকিত তড়িত-আলোকে।
              ঝঞ্জনমঞ্জীর বাজায় ঝঞ্ঝা রুদ্র আনন্দে।
              কলো-কলো কলমন্দ্রে নির্ঝরিণী
              ডাক দেয় প্রলয়-আহ্বানে॥

              বায়ু বহে পূর্বসমুদ্র হতে
              উচ্ছল ছলো-ছলো তটিনীতরঙ্গে।
              মন মোর ধায় তারি মত্ত প্রবাহে
              তাল-তমাল-অরণ্যে
              ক্ষুব্ধ শাখার আন্দোলনে॥

                দেবপ্রসাদ সিংহ

                "আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান" - জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে পৌঁছিয়েছি। পিতামাতার হাত ধরে এই দীর্ঘ পথ চলা শুরু করেছিলাম। পথিমধ্যে আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক-গুরু, বন্ধু-বান্ধব নানা প্রিয়জনদের সান্নিধ্য লাভ করবার সৌভাগ্য হয়েছে। মনের মধ্যে নানারকম ভাবে ঈশ্বরচিন্তাও এসেছে। নানা মনীষীর নানা ভাবধারাতেও সমৃদ্ধ হয়েছি। কিন্তু জ্ঞান-উপলব্ধি হওয়ার পর যে মানুষটি সুখে দুঃখে আমার চিরসখা হয়েছেন, তিনি তো আমার, তোমার, আমাদের, তোমাদের সকলের রবীন্দ্রনাথ। সকল বাঙ্গালীর মতন আমার জীবনেও তিনি সর্বতোভাবে জড়িয়ে আছেন। ছোটোবেলা থেকেই সঙ্গীতচর্চা করি। তবে সাধক হতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডী পেরিয়ে একটু ভিন্ন ধারার (পুরাতনী) সঙ্গীত শিক্ষা লাভ করি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে আমার পিতার আকস্মিক প্রয়াণে মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পরি। বড়ো একাকীত্ব অনুভব হোতো। নিজের অজান্তে মনের মধ্যে ভেসে উঠতো "তোমার অসীমে, প্রাণ মন লয়ে....... মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ...... "; ".....সব যে হয়ে গেলো কালো...... ", তখনই আবার ভেসে উঠতো আমার পিতৃদেবের প্রিয় "নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে........"; "তুমি যত ভার দিয়েছো সে ভার......" । ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন আমার পরম আশ্রয়দাতা, আমার শান্তিনিকেতন। তখনও আমি তাঁকে আমার "নিভৃত প্রাণের দেবতা....... " হিসাবেই হৃদয়ের সিংহাসনে বসিয়ে রেখেছি। ভাবিনি সেই ভাবে প্রকাশ্যে আসবো কোনোদিন। একদিন "বাল্মীকি প্রতিভা"র অনুশীলন চলছিলো, বালিকাকে বলি দিতে গিয়ে দস্যু রত্নাকরের আকস্মিক রূপান্তর "এ কেমন হোলো মন আমার, কি ভাব এ যে....... ", গানটা করতে করতে এক অদ্ভুত শিহরণ হয়, গলার স্বর কাঁপতে থাকে, চোখে জল এসে যায়। এ কি অদ্ভুত মানসিক পরিবর্তনের শৈল্পিক প্রকাশ! কি অসাধারণ! তখন থেকেই আমার মনের কোণে এক সুপ্ত বাসনা ধীরে ধীরে স্বপ্নে পরিণত হয়ে বাস্তবায়িত হয় নৃত্যনাট্য "মহারূপান্তর"এর মাধ্যমে। এক ভয়ংকর দস্যুর মহা ঋষিতে রূপান্তর এবং পরিশেষে মহাকবিতে রূপান্তর, কি সাবলীলতার সাথে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর "বাল্মীকি প্রতিভা" তে। বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে এটা যে কতটা প্রাসঙ্গিক। আজ আমি ধন্য, তাঁর সেই বার্তাকে সমাজে এক নবরূপে ছড়িয়ে দিতে আমার প্রচেষ্টা বহু মানুষের আশীর্বাদ পেয়েছে। এখানেও তিনিই ছিলেন আমার এই অদম্য প্রচেষ্টার প্রধান পৃষ্ঠপোষক "হবে জয়, হবে জয়, হবে জয় রে.......... "। আজ তিনি তাই আমার হৃদয়ের মহাসিংহাসনে - "মহাসিংহাসনে বসি শুনিছ, হে বিশ্বপিত, তোমারি রচিত ছন্দে মহান্‌ বিশ্বের গীত॥ মর্তের মৃত্তিকা হয়ে ক্ষুদ্র এই কন্ঠ লয়ে আমিও দুয়ারে তব হয়েছি হে উপনীত॥ কিছু নাহি চাহি, দেব, কেবল দর্শন মাগি। তোমারে শুনাব গীত, এসেছি তাহারি লাগি। গাহে যেথা রবি শশী সেই সভামাঝে বসি একান্তে গাহিতে চাহে এই ভকতের চিত॥"

                 

                  জিষ্ণু হাটী

                  আমি ও রবি - নেতি থেকে প্রীতি...

                  রবীন্দ্র ভক্ত হিসাবে অনেকের কাছেই আমার পরিচিতি। রবি ঠাকুরের চ্যালা, রবির ছানা, রবীন্দ্রনাথের ছেলে... ইত্যাদি নানান সম্বোধন শুনতে হয় সময়ে-সময়ে। যদিও জানি যার পুরোটাই ব্যঙ্গোক্তি! তবু স্বভাব-নিরবিবাদী, প্রশংসা বা নিন্দা উভয় ক্ষেত্রেই মৌনব্রত অবলম্বী। যাই হোক, যে কথা বলা - অনেকের কাছে আমার যে এই রবীন্দ্র-পরিচিতি, তাদের অনেকেই অজানা তার আগের বা শুরুর কথা। বলি সে কথা।

                  তখন কতটুকু আমি! মনে পড়ে না। মায়ের বয়সী পাড়ার দিদিরা পালা করে একে-অন্যে কোলে চাপিয়ে ঘুরে ঘুরে হাততালি দিয়ে গাইছে - তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ... আমাকে পেয়ে দিদিরা যে আনন্দিত সেই আনন্দে আমিও হাসি-খেলায় মত্ত। পরবর্তী জীবনে "হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে" আবিষ্কার করবো জীবনের প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতকে, তখন কে জানতো!

                  লেখাপড়ার পালা শুরু হতেই "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর", নাম জানলাম। পরিচিত হবার সুযোগ পেলাম না। যেটুকু পরিচয় তা ওই, বছরে একটা দিন "পঁচিশে বৈশাখ"। পঁচিশে বৈশাখ, চিরনূতনে দিল ডাক... হাঁকতে হাঁকতে প্রাইমারি স্কুলের প্রভাতফেরী, ফুল ছেটানো আর গাদা-গুচ্ছের ফুল-মালায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাঁধানো ছবিটাকে ঢেকে দেওয়া। ব্যস। পুজো শেষ। ওনাকে নমস্কার করতে হয়! প্রণাম কর! একটু বড় হয়ে আরো জানলাম, আমাদের জনগণমনঅধি! ওনারই লেখা। জাতীয় সঙ্গীত, দাঁড়াতে হয়।

                  আর বাকি সময়টা! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার দু'চোখের বিষ! হ্যাঁ, বিষ। সহ্য করতে পারতাম না মোটে! কেন এত পড়তে হবে লোকটাকে! এত লেখার ওর কী দরকার ছিল! আর কোনো কাজ ছিল না! নিজেকে তো পড়তে হয়নি, তাহলে বুঝতো! জঘন্য একটা! রেডিও, টিভিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজলেই চ্যানেল ঘুরিয়ে দিতাম। ম্যা গো! কী প্যানপ্যানানি সব গান! শুনবো না। একান্ত বাধ্যতা ছাড়া রবীন্দ্রনাথ থেকে দূরে-দূরে পালাতাম। আর কাছে থাকা সময়টাতে একরাশ বিরক্তি।

                  তখন হাইস্কুল, ক্লাস এইট। ছোটদের ভূতের গল্পের জগৎ ছেড়ে এবার বড়দের বই পড়তে হবে। টাকা জমিয়ে প্রথম বড়দের বই কিনলাম। সঞ্চয়িতা আর গীতবিতান। আমার নিয়তি বোধকরি সেদিন খুব হেসেছিল। এতকাল যাকে দূরে ঠেলেছি, আশ্চর্য সমাপতনে সেই কাছে এল! এলো তো এলো এতটাই এলো যে, কী এক ঘোরের মধ্যে পড়ে চলেছি একের পর এক কবিতা, গান... পড়তে হবে, আরো পড়তে হবে! কিনে চলেছি একের পর এক রবীন্দ্রনাথের লেখা। মন পোষাচ্ছে না! কিনে ফেললাম সমগ্র রবীন্দ্ররচনাবলী।

                  নেশা লেগেছে। জানতে হবে রবীন্দ্রনাথকে। কিন্তু আমার তো সামর্থ্য স্বল্প! কার কাছে, কোথায় সাহায্য পাব! ডুবন্ত প্রাণ যেমন নাগালে যা পায় তাই আঁকড়ায়, আমিও তেমন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত যেখানে যা পাই সংগ্রহ করি। ভাঁড়ার ভরে ওঠে, কিন্তু পূরণ হয় না। বুঝলাম - এ পূরণ হবারও না। জানলাম - একজীবনে রবীন্দ্রনাথকে জানা অসম্ভব, অন্ততঃ আমার পক্ষে তো অবশ্যই! খোঁজ তাই চলতেই থাকে।

                  চির-মুখচোরা। কথা ফুটলো। রবীন্দ্রনাথের কবিতা। লিখতে শুরু করলাম। বাক্য দিল রবীন্দ্রনাথ। গণ্ডিবদ্ধ জীবনে পরিচয়ের দরজা খুলে গেল। আলাপ জমলো রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে। শিক্ষক পেলাম, অভিভাবক পেলাম, বন্ধু পেলাম, আপনজনে ভরে উঠলো চারিপাশ, নিজের একটা পরিচয় পেলাম, সম্মান পেলাম, আদর পেলাম, আমাকে যে কেউ হিংসা করতে পারে, এটা জানলাম! এতকিছু পেলাম কার দৌলতে - না, এককালে যাকে না ভালোবেসেছিলাম তার দৌলতে। কিছু নিজেরও তো দায়িত্ব বর্তায়!

                  কবিতা-গানের রবীন্দ্রনাথ, সে বাঙালী মাত্রেই পরিচিত। কিন্তু তার বাইরে যে বিরাট রবীন্দ্রনাথ! পরিচয় করাতে হবে। না জানা মানুষের না জানাটা ব্যাপক, কিন্তু জানা মানুষের জানাটাও যে বড় নগণ্য! আমার জানাটা ভাগ করতে হবে আমার না জানার পরিধীকে কম করার জন্য। শুরু হল প্রয়াস, মাধ্যম নিলাম ফেসবুক, একে একে জুটে গেল দোসর... মাভৈঃ!